
পশ্চিমবঙ্গের আদি অনন্ত সংস্কৃতির একটা অন্ধকার দিক ও রয়েছে। তা হলো ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব। কত শতাব্দী প্রাচীন কিংবা সহস্রাধিক বর্ষ পেরিয়ে এসেও বাংলার অনেক নাম না জানা মন্দির তাদের জৌলুশ হারিয়েছে। পরিবর্তে রয়ে গেছে কতগুলো পাঁজর বেরিয়ে থাকা খিলান, মন্দির এর ধ্বংসাবশেষ, কিংবা নিদেনপক্ষে শুধু বেদি টা।
এই ধরুন, প্রত্যন্ত গ্রামের ভিতর কোথাও একটা বহু পুরোনো মন্দির। শহুরে হওয়া লাগেনি, তাই মন্দিরের বাইরে পাণ্ডাদের ভিড় নেই, ঠাকুরের কাছে দাবি দাওয়া নিয়ে নিলাম নেই, ঘটা করে ভিসিট ফি নিয়ে মূর্তি দর্শন নেই, কিংবা প্রসাদ এর স্পেশাল স্টল ও নেই!! আছে বলতে একটা ভাঙাচোরা দেয়াল, আর সেই শতাব্দী প্রাচীন দেওয়াল এর গায়ে ঘুঁটে চড়ানো! কোনো এককালে কোন সে মনীষী কি যে বানিয়ে গিয়েছেন, তাতে তাদের বয়েই গেছে!
বহু গ্রাম এ এমন বহু মন্দির দেখেছি, যাদের দেওয়ালে বট অশ্বত্থ এর ভীড়, ঘুঁটে দেওয়া, পাঁচিল এ কাপড় শুকাচ্ছে, দালানে ধান শুকাচ্ছে আরো কত কি! তবুও গ্রাম বলে আছে। শহর হলে কবেই সে মন্দির বহুতল ফ্ল্যাট হয়ে যেত!

ছবি টা পাথরা র। নেট থেকে যখন রিসার্চ করছিলাম, এর ইতিহাস টা জানার পর অনেক দেখতে ইচ্ছে করছিল। ভেবেছিলাম বিষ্ণুপুর এর মতো এখানেও বুঝি একখানা মন্দির সাম্রাজ্য রয়েছে।
হ্যাঁ রয়েছে। তবে নিত্যান্তই অবহেলায়। হেরিটেজ এর ২-৩ টে বোর্ড না থাকলে আর ক বছর পরে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এ নামতে হতো পাথরা কে। আর তার পিছনের অন্যতম কারণ ব্যবহারিক শিক্ষা।
ঘন্টা দুয়েক বসেই ছিলাম। নিশ্চিন্তে! কংসাবতীর পাড়ে দিব্বি শান্ত জায়গা। পাখির আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না প্রায়। বাধ সাধলো ফটোশুটের দল! তুলবে তুলুক, তবে কিনা স্থাপত্যের অযত্ন করে তার যাচ্ছেতাই ব্যবহার মোটেই মানায় না। একজন তো দেখলাম স্কুটি নিয়ে স্টান্ট দেখাতে গিয়ে মন্দিরের দালানেই চড়িয়ে দিলো!! উপস্থিত গার্ড এর বকুনিতে সে যাত্রায় মন্দির খানা বেঁচে গেল! কিন্তু কতদিন!
কিছু মানুষের আরও একটা বদভ্যাস হলো নিজেদের বিয়ের কার্ড এইসব মন্দির এর গায়ে ছাপিয়ে আসা! জানিনা সেগুলো ম্যারেজ সার্টিফিকেট এর কাজে দেয় কি না! কিন্তু সেসব মন্দির গুলোর সৌন্দর্য যে নষ্ট করে, তাতে আর সন্দেহ কি! অমুক + তমুক করতে গিয়ে নিজেদেরই সংস্কৃতি আমরা নষ্ট করছি! এবং তার একমাত্র কারণ আমাদের অপর্যাপ্ত ব্যবহারিক জ্ঞান।

বহু মানুষকে দেখেছি, তাদের গ্রামের বা জেলার এইসব মন্দির গুলোকে প্রচারের আলোয় এনে এদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে। তাদের এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে সফল হোক, তাই কামনা করি।