জলঙ্গির অচেনা এক গ্রাম …সন্ধ্যার মাদকতায়…

দেবীপুর, ধুবুলিয়া, কৃষ্ণনগর, নদিয়া

এটা কোন ভ্রমণ স্থান নয়। তবে ভ্রমণ স্থান হয়ে উঠতেও বাধা কোথায়! সেদিন বেথুয়া যাবার পথে আমার এক বন্ধুর পরিচিত এক দাদার বাড়িতে ওঠার কথা ছিল। কৃষ্ণনগর এন এইচ থার্টি ফোর হাইওয়ের পাশে ধুবুলিয়া বাজার। সেখানে পৌঁছে সেই দাদাকে যখন বললাম বেথুয়া দেখতে এসেছি, বললেন "সে যাবে যাও, তবে তার চেয়ে ভালো জঙ্গল আমার গ্রামে দেখবে চলো!" বেথুয়া থেকে ফিরে তার গ্রামের দিকেই চললাম। একটুখানি এগোতেই বুঝলাম তার তাচ্ছিল্য নেহাত মিথ্যে নয়! সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা ক্রমশ মাটির রাস্তা হয়ে উঠলো। আচমকা দেখি, পাশে ধানক্ষেতের দুপাশে ঝোপ ঝাড় থেকে শিয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে! বিকেলবেলায় রাস্তায় শিয়াল দেখে বেশ অবাকই হলাম আমি। সচরাচর রাত ছাড়া আমি দেখিনি শেয়াল। ক্যামেরা বার করার আগেই উধাও হল তারা! আরও খানিক গিয়ে পৌছালাম তার বাড়ি। গুগল ম্যাপ এ গ্রামটির নাম দেবীপুর। দাদার মুখ থেকে শোনা 130 ঘর লোকের নাকি বাস নাকি সেখানে। আসতে আসতে দেখেছিলাম, সবার বাড়ির উঠোনগুলো বেশ বড় বড়। লোভনীয় তো বটেই!! শহরের এক একটা বাড়ি সে উঠোনে দিব্যি এঁটে যাবে। চারিদিকে ধান জমি আর রাস্তার ধারে এত বড় বড় বট অশত্থ শিমুল গাছের নিচে গ্রামটা যেন তার স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছে। বাছুরগুলো তখন তাদের ঘরফিরতি মায়েদের আদর খেতে ব্যস্ত। এক মা মুরগি তার ছেলে পুলে নিয়ে একটা বাড়ির উঠোনে ছোটাছুটি করছে! গরুর গাড়ি তার আপন মনে চলেছে রাস্তা ধরে। শহর ছেড়ে এতদূর এসে কিছুমাত্র আফসোস হয়নি আমাদের। খাওয়া দাওয়ার পর গ্রাম দেখতে বেরিয়েছিলাম। আসন্ন পূর্ণিমার সন্ধ্যায় আসল সৌন্দর্যটা চোখে ধরা দিল এবার। বাড়ির পিছনে বাঁশবন আর তার মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা অন্ধকার মেঠোপথ। অশান্ত ঝিঁঝির ডাক, গাছগুলোর উপরে পাখিদের ঘরে ফেরার উৎসব। বাঁশবন পেরোতেই মাটির বাঁধটাকে টপকে জলঙ্গীর শান্ত নিস্তব্ধতা। ওপারে ইটভাটার হ্যালোজেনের আলো, তবে তার চেয়েও স্পষ্ট চাঁদের আলো আর তার ছায়া জলঙ্গীর জলে। নদীতে তখন মৃদু অথচ স্পষ্ট জলের বয়ে যাওয়ার শব্দ। অন্ধকারের নীলচে আভায় সে তখন অপূর্ব এক নৈসর্গিক মাদকতা। আপনা থেকেই হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করবে সেই জলের ঢেউয়ে, শহরের সব কিছু ছেড়ে রেখে... হয়তো এমনই কোন সবুজ করুণ ডাঙায় কবি জীবনানন্দ আবার ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আজও তাঁর জাম-বট-কাঁঠাল-হিজল-অশথ তমালরা একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির জলঙ্গীতে। ভাবি, এমনটা ঠিক বর্ষাকাল হতো, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে নদীর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ বুকের মাঝে নতুন প্রেমের ঢেউ তুলতো! কিংবা এই যদি শীতকালের চাদর মুড়ি ভোর হতো, কুয়াশা ঢাকা নদীর স্নিগ্ধতা ছেয়ে যেত আমার শরীরে। এমন সব ভাবনা জাগলে আর ইচ্ছা হয় না ফিরে চলি শহরে। তবু ফিরতে তো হবেই! ফেরার সময় বলে এসেছিলাম! "আবার আসবো ফিরে" জলঙ্গীর ঢেউ এ চেপে বাংলার অপরূপ রূপ দেখতে...!

ছবিগুলো তুলেছিলাম বটে, তবে খালি চোখে যা দেখেছি, তা কখনো এই ছবিতে বর্ণনা করতে পারবো না!!

আমার সঙ্গে Amit Kumar Shaw,
Amit Das & Koushik Das
Redmi Note 5 Pro | Unedited

Leave a comment